সায়েন্স ওয়ার্ল্ড
Now Reading
অবশেষে মহাকর্ষ-তরঙ্গের খোঁজ
১০০ বছর পর আইনস্টাইনের ‘জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি’ ১০০% সঠিক প্রমাণিত

পৃথিবীজুড়ে পদার্থবিজ্ঞানীরা উল্লসিত। বিজ্ঞানের ইতিহাসে ২০১৬-র ১১ ফেব্রুয়ারি গণ্য হল ‘রেড লেটার ডে’ হিসেবে। ওয়াশিংটনে ‘ইউএস ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে বিজ্ঞানী ডেভিড রিৎজ আজ ঘোষণা করলেন, ‘‘আমরা মহাকর্ষ-তরঙ্গের খোঁজ পেয়েছি।’’

আরও এক বার অগ্নিপরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হলেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। বুঝিয়ে দিলেন, মহাবিশ্বকে ভাল ভাবে চিনতে হলে কেন দ্বারস্থ হতে হবে শুধু তাঁরই। কেনই বা শুধু আইজ্যাক নিউটনের ভাবনার আশ্রয়ে সবটা চেনা যাবে না।

যেমন হয়েছিল চার বছর আগে ৪ জুলাই। যে দিন জেনেভার কাছে সার্ন গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করেছিলেন ‘ঈশ্বরকণা’র অস্তিত্ব। যে কণা না থাকলে ব্রহ্মাণ্ডে কোনও বস্তু ভারী হতো না। আর আজ? ওয়াশিংটনের বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করলেন, মহাশূন্যে ধুন্ধুমার ঘটনা ঘটলে (প্রচণ্ড ভারী দু’টি নক্ষত্রের একে অন্যকে চক্কর কিংবা দু’টো ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষ এবং মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া), সে সব থেকে চার দিকে এক ধরনের তরঙ্গ বা ঢেউ ছড়ায়। যার নাম মহাকর্ষ-তরঙ্গ।

এক দিক থেকে দেখলে, মহাকর্ষ-তরঙ্গের আবিষ্কার ঈশ্বরকণা বা হিগস-বোসন কণা আবিষ্কারের থেকেও এটা বড় সাফল্য। কারণ হিগস-বোসন যে আছেই, সে ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের সন্দেহ ছিল না। অপেক্ষা ছিল শুধু তা খুঁজে পাওয়ার। কিন্তু মহাকর্ষ-তরঙ্গ যে আছেই, সে ব্যাপারে অনেক বড় বড় বিজ্ঞানী নিশ্চিত ছিলেন না। আইনস্টাইনের ‘জেনারেল রিলেটিভিটি থিওরি’র ব্যাখ্যা এ ক্ষেত্রে ঠিকঠাক করা হচ্ছে না বলে মনে করতেন অনেকে। সে রকম একটি জিনিসের অস্তিত্ব প্রমাণ সত্যিই বড় সাফল্য।

মহাকর্ষ-তরঙ্গ যে শনাক্ত হয়েছে, সে রকম গুজব কিছু দিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল। ইন্টারনেটও ছয়লাপ হচ্ছিল এ বিষয়ের উপর নানা ব্লগে। কিন্তু পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা কিছুতেই মুখ খুলছিলেন না। অবশেষে আজ সব গুজবের অবসান ঘটিয়ে গবেষকেরা জানালেন, সত্যি সত্যিই যন্ত্রে ধরা পড়েছে ওই তরঙ্গের অস্তিত্ব।

বিজ্ঞানী রিৎজ জানালেন, ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে সূর্যের থেকে ২৯ গুণ এবং ৩৬ গুণ ভারী দু’টো ব্ল্যাকহোল একে অন্যের সঙ্গে মিশে একটা ব্ল্যাকহোলে পরিণত হওয়ার সময় ওদের চারপাশে ‘স্পেসে’ যে তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল, তা গত বছর ১৪ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর যন্ত্রে ধরা পড়েছিল। রিৎজ বলছিলেন, ‘‘সত্যিই কি তার সঙ্কেত পেয়েছি আমরা? জানতে ডেটা চেক এবং রি-চেক করেছি কয়েক মাস ধরে। তারপর নিঃসন্দেহ হয়ে আজ ঘোষণা করছি আমাদের সাফল্য।’’

এমন তরঙ্গের অস্তিত্ব যে থাকতে পারে, তা জানা গিয়েছিল ঠিক ১০০ বছর আগে, আইনস্টাইনের ‘জেনারেল রিলেটিভিটি’-র তত্ত্ব থেকে। তত্ত্বে থাকলে কী হবে, বাস্তবে সেই তরঙ্গের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে লাগল ১০০ বছর! চেষ্টা যে আগে হয়নি তা নয়। প্রথমে বিক্ষিপ্ত ভাবে, তার পর গত দু’দশক ধরে গভীর ভাবে। সেই চেষ্টা, এবং কোটি কোটি ডলার ব্যয়ের ফল মিলল এত দিনে। গবেষণা একেই বলে! বিজ্ঞানীরা তো উল্লসিত হবেনই।

inf1মহাকর্ষ তরঙ্গ আসলে কি?
উত্তর পেতে ওই তরঙ্গ কী থেকে জন্মায়, তা বোঝা দরকার। আর জানা দরকার মহাকর্ষ সম্পর্কে নিউটন ও আইনস্টাইনের ব্যাখ্যার ফারাক। নিউটন বলেছিলেন, মহাকর্ষ হল দুই বস্তুর মধ্যে অদৃশ্য আকর্ষণ বল। আইনস্টাইনের মতে, মহাকর্ষ তা নয়, মহাকর্ষ আসলে অন্য ব্যাপার। কী? যে কোনও বস্তু নিজের চারপাশে শূন্যস্থান বা ‘স্পেস’-কে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। তার মানে, মহাকর্ষ আসলে শূন্যস্থান বা ‘স্পেস’-এর জ্যামিতির খেলা। নিউটনের মতে, সূর্য পৃথিবীকে কাছে টানতে চায় বলে পৃথিবী তার চারদিকে ঘোরে। আর আইনস্টাইনের ব্যাখ্যায়, সূর্যের উপস্থিতিতে তার চারপাশের ‘স্পেস’ যে দুমড়ে-মুচড়ে যায়, সেই ‘স্পেস’-এর মধ্যে দিয়ে চলার সময় পৃথিবীর গতিপথ বেঁকে যায়।

এ বার ধরা যাক, কোনও কারণে সূর্যটা হঠাৎ আকাশ থেকে উধাও হয়ে গেল! নিউটনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সূর্য উধাও হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী সেই নিরুদ্দেশের খবর পাবে এবং সে কক্ষপথ পাল্টে দূরে হারিয়ে যাবে। আইনস্টাইনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তা ঘটবে না। সূর্যের নিরুদ্দেশের খবর পৃথিবী সঙ্গে সঙ্গে পাবে না। সে খবর আসবে তরঙ্গের মাধ্যমে, এবং তা আসতে কিছুটা হলেও সময় লাগবে। ওই ঢেউ-ই মহাকর্ষ-তরঙ্গ। মহাশূন্যে প্রচণ্ড ভারী বস্তুর হঠাৎ নড়াচড়ার ফলে ওই ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়।

আইনস্টাইন এবং নিউটনের তত্ত্বের মধ্যে কোনটা ঠিক, তা নির্ধারণ করার পক্ষে মহাকর্ষ-তরঙ্গ অনুসন্ধান একটা বড় পরীক্ষা। আইনস্টাইন ওই তরঙ্গের কথা বলেছিলেন। নিউটন তা বলেননি।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এই যে, আইনস্টাইন নিজেও প্রথম দিকে মহাকর্ষের অস্তিত্ব মানতে চাননি। পরে অবশ্য তিনি নিজের তত্ত্বের ওই ফলাফল মেনে নেন। এই মানামানির ব্যাপারে আইনস্টাইনের ভাবনা-চিন্তা কিন্তু বিচিত্র। আইনস্টাইন মানতে চাননি যে, ব্ল্যাক হোল বাস্তব বিশ্বে থাকতে পারে।

ঢেউয়ের ফলে ‘স্পেস’ কাঁপে। মানে আয়তনে এক বার বড় এবং এক বার ছোট হয়ে যায়। যে হেতু ঢেউয়ের জন্ম পৃথিবী থেকে হাজার-হাজার আলোকবর্ষ দূরে, তাই তার প্রভাব যখন পৃথিবীতে পৌঁছয়, তখন তা ক্ষীণ হয়ে যায়। ওই ক্ষীণতাই মহাকর্ষ-তরঙ্গ শনাক্ত করার প্রধান অন্তরায়। পৃথিবীতে আছে নানা রকম ঝাঁকুনি— ভূমিকম্প, ভারী ভারী ট্রাকের গতি, এমনকী সমুদ্রের ঢেউয়েও হতে পারে আছড়ে পড়ার ঘটনা। তার মাঝখান থেকে পৃথিবীতে পৌঁছনো অতিক্ষীণ মহাকর্ষ-তরঙ্গ শনাক্ত করা খুব কঠিন কাজ। অতি সংবেদশীল যন্ত্রের সাহায্যে সেটাই আমেরিকায় করছেন বিজ্ঞানীরা।

ঠিক কী ভাবে শনাক্ত হল মহাকর্ষ-তরঙ্গ?
যে প্রকল্পে কাজ হয়েছে, তার নাম ‘লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল-ওয়েভ অবজার্ভেটরি’ (এলআইজিও)। আমেরিকার লিভিংস্টোন এবং হ্যানফোর্ড শহরে চার কিলোমিটার লম্বা দু’টো ফাঁপা পাইপের দৈর্ঘ্য লেজার-রশ্মির সাহায্যে মেপেছেন বিজ্ঞানীরা। মাপতে গিয়ে দেখেছেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর যখন দু’টো ব্ল্যাক হোল মিশে গিয়ে মহাকর্ষ-তরঙ্গ সৃষ্টি করেছিল, তখন ওই চার কিলোমিটার আর চার কিলোমিটার ছিল না। বেড়ে-কমে গিয়েছিল। অর্থাৎ, স্পেসের আয়তন বাড়ছিল এবং কমছিল।

বিজ্ঞানীরা উল্লসিত, কারণ এ বার থেকে নতুন এক ‘চোখে’ দেখা যাবে মহাবিশ্বকে। আগে দেখা যেত শুধু কোনও ঘটনা থেকে আসা আলোর সাহায্যে। এ বার দেখা যাবে একেবারে নতুন আর এক উপায়ে। এত দিন মহাবিশ্ব যেন ছিল শুধু এক নাটক, যাতে অভিনেতাদের শুধু মঞ্চে আসা-যাওয়া অনুধাবন করা যেত। এখন থেকে শোনা যাবে তাঁদের কথাবার্তাও।

আরেকবার অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের অমরত্ব অর্জন!
একশো বছর পর প্রমাণ হল, আইনস্টাইন ১০০% সঠিক! জটিল সব অঙ্ক কষে তিনি যা যা বলেছিলেন, তার প্রায় সবটুকুই ঠিক। এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হলো বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড মোটামুটি তাঁর বলে দেওয়া গাণিতিক নিয়মেই চলে।

১০০ বছর ধরে বিস্তর ঘাম ঝরানো খোঁজাখুঁজির পরে সরাসরি হদিশ পাওয়া গেল ‘গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ’ বা, মহাকর্ষীয় তরঙ্গের। অবশ্য এর জন্যে আইনস্টাইনকে নোবেল পুরস্কার দিলে, হয়তো নোবেল পুরস্কারটাই খাটো হয়ে যায়!

einযদিও এক বার লজ্জায় তিনি জিভ কেটেছিলেন! কিন্তু পরে বোঝা গিয়েছিল, কোনও ভুলই তিনি করেননি ‘গ্র্যাভিটেশনাল কনস্ট্যান্ট’ বা ‘মহাকর্ষীয় ধ্রুবকে’র মাপজোকে। তার পর শুধুই দশকের পর দশক ধরে তাঁর জয়ের খবর আসছিল একের পর এক। ১৯১৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের একের পর এক পূর্বাভাস যখন মিলতে শুরু করেছিল। একেক বছরে একেকটা। বা একেক দশকে।

তাঁর সাড়া জাগানো তত্ত্বের বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাসই প্রমাণিত হয়েছিল চার বছরের মধ্যে। সে ক্ষেত্রে ১৯১৯ সালটি ছিল একটি মাইল ফলক।

কিন্তু, তাঁর চমকে দেওয়া তত্ত্বের একটি পূর্বাভাসের সরাসরি প্রমাণ মিলছিল না কিছুতেই। সেটি হল, ‘গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ’ বা, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। ১৪০০ কোটি বছর আগে মহা বিস্ফোরণ বা ‘বিগ ব্যাং’-এর পর জন্ম নেয়া উত্তাল ঢেউগুলোই মূলত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। পুকুরে ঢিল ফেললে যেমন একটা তরঙ্গ ছড়াতে ছড়াতে তার পারে পৌঁছে যায়, তেমনই এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে এখনও ওই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে। আর চার পাশে অসম্ভব দ্রুত হারে ব্রহ্মাণ্ড এখনও প্রসারিত হয়ে চলছে বলে সেই তরঙ্গের পরিধিটা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে।

কিন্তু, এতোদিন সরাসরি তার সন্ধান পাচ্ছিলেন না মহাকাশবিজ্ঞানীরা। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল, আইনস্টাইন আদৌই সঠিক ছিলেন তাঁর সাড়া জাগানো তত্ত্বে? নাকি তাঁর গাণিতিক পূর্বাভাসের কোথাও কোনও ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে গিয়েছিল? যদি থাকে, তা হলে তা কোথায়, তা খোঁজার চেষ্টা তো চলছিলই, ভাবনা শুরু হয়েছিল তাঁর তত্ত্বের পরিবর্ধন-পরিমার্জনেরও। কিন্তু, তিনি আইনস্টাইন। তাঁকে ছাড়া আধুনিক বিজ্ঞান যে আক্ষরিক অর্থেই, ‘অচল’, একশো বছর পর সেটাই প্রমাণিত হল গতকাল বৃহস্পতিবারের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কৃত হওয়ার ঘোষণায়। ১৯১৫ সালে তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের যে গাণিতিক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন তিনি, তা পুরোদস্তুর সঠিক। সরাসরি সন্ধান পাওয়া গেল মহাকর্ষীয় তরঙ্গের। আর তা মিলেছে দু’টি কৃষ্ণ গহ্বরের মধ্যে সংঘর্ষের সময়ে যে তরঙ্গের সৃষ্টি হচ্ছে, তার থেকেই।

ধরা যাক, দূরে, বহু দূরে, মহাবিশ্বের অন্য কোনও প্রান্তে কোনও এক গ্যালাক্সিতে একটি দৈত্যাকার তারার মৃত্যু হল। অসম্ভব রকমের উষ্ণ, উদ্দাম তাপ-পারমাণবিক বিক্রিয়ায় সেই তারার দেহের প্রায় পুরোটাই চুর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল সেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণে। আমরা লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে বসে সাক্ষী হয়ে থাকলাম সেই নজরকাড়া মহাজাগতিক ‘আতশবাজি’র! মহাশূন্যে শব্দের বিস্তার ঘটে না বলে আমরা সেই ‘মহাবজ্রে’র ঝঙ্কার শুনতে পেলাম না। কিছু দিন বাদে সেই বিস্ফোরণের ফলে দৈত্যাকার তারাটির ধ্বংসাবশেষ চার দিকে ছড়িয়ে পড়লে হয়তো সেই জায়গায় পড়ে থাকবে অসম্ভব রকমের ঘন ও ভারী কোনও অবশিষ্ট। যা, নিউট্রন তারা হতে পারে। হতে পারে ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ গহ্বর।

slack-imgs.com__1.jpeg

আর কিছু হল কি সেই বিস্ফোরণের ফলে? আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ বলছে, আমাদের চোখের আড়ালে আরও অনেক কিছু ঘটে গিয়েছে সেই বিস্ফোরণে। বিস্ফোরণে ওই তারার ‘শরীরে’ উপাদানের পুনর্বণ্টন হয়েছে। আর, তার ফলে তার আশপাশে অনেকটাই পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে তার মহাকর্ষের।

আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে বলা হচ্ছে, যে কোনও দুটো বস্তুর মধ্যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণের কারণ হল, তাদের ভরের ফলে তারা তাদের আশপাশের স্থান-কালকে বিকৃত করে দেয়। টানটান করে বাঁধা একটি চাদরের মাঝে একটা পাথর রাখলে যেমন তৈরি হয় একটি উপত্যকার। সেখানে যদি একটা ছোট্ট গুলিকে গড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে সেই গুলির গড়িয়ে যাওয়াকে আমরা ভাবতে পারি, যেন তা কোনও বড় পাথরের আকর্ষণেরই ফল।

আপেক্ষিকতাবাদ বলে, এই আকর্ষণকে আমরা যেন দেখি ওই অবতরণের ফল হিসেবেই। তার মানে, ব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্রই স্থান-কাল আছে যেন এক চাদরের মতো। বস্তুর গতি অন্য বস্তুর আকর্ষণের ফলে নয়, ওই স্থান-কাল-চাদরের বিকৃতির ফলেই। তাই যদি হয়, তা হলে তারার মৃত্যুতে যে আকস্মিক বিস্ফোরণ ঘটল, তাতে উথালপাথাল হওয়া উচিত ওই স্থান-কাল চাদরের। সুদূরপ্রসারী ঢেউ খেলে যাওয়া উচিত সব দিকে এই বিস্ফোরণের খবর পৌঁছে দিয়ে। শব্দ-বিস্তার নাই-বা হল। এটাই এ ক্ষেত্রে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের ভাবীকথন।

এই দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া স্থান-কালের অন্তরালে, আমাদের সীমিত দৃষ্টির বাইরে, মহাবিশ্বে সব সময় ঘটে চলছে অনেক চমকপ্রদ ঘটনা। গ্যালাক্সি-গ্যালাক্সিতে মিলেমিশে এক হয়ে যাওয়া, তারায় তারায় ধাক্কা, ব্ল্যাক হোল আর নিউট্রন তারার মধ্যে সঙ্ঘাত-সঙ্ঘর্ষ। এ সব ঘটনায় আলো উত্পন্ন হয় না, তাই কখনওই আমাদের চোখে পড়বে না সেই সব নাটকীয়তা। অথচ স্থান-কালের চাদর এতে আলোড়িত হচ্ছে।

তাই বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মধ্যেই লুকিয়ে থাকবে বিজ্ঞানের অনেক জটিল রহস্যের সমাধান আর বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের অমরত্ব।

নিচের বাটনগুলোর সাহায্যে খবরটি শেয়ার করুন