এন্ট্রাপ্রেনারশিপ
Now Reading
ডার্ক সাইড অব এন্ট্রাপ্রেনারশিপ
শুধুমাত্র আপনার ভাবনাই বদলে দিতে পারে এই বিশ্বকে। এই চিন্তা-ভাবনাটা হতে হবে একটু ভিন্ন ধরনের। আর এই জন্য আপনাকে অবশ্যই একজন সাহসী উদ্যোক্তা হতে হবে।

ডার্ক সাইড অব এন্ট্রাপ্রেনারশিপ

কিছু মানুষ বর্তমান বিশ্বে দুর্দান্ত কিছু আইডিয়া দিয়ে শুধু চলমান সভ্যতার গতিপথকেই পাল্টে দেয়নি, ভাগ্য পরিবর্তিত হয়েছে সেই সব মানুষদেরও। তারা রীতিমত বিলিয়নিয়ার ব্যতিক্রমী উদ্ভাবনী আইডিয়ার কারণে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এদের সবারই শুরু একেবারে জিরো থেকে। তারা শুধুমাত্র বিলিয়নিয়ার হয়েছেন নিজেদের মেধাকে কাজে লাগিয়েই।

আপনিও চাইলে শুধু নিজের অবস্থার পরিবর্তন নয় সমগ্র বিশ্বেরই এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিতে পারেন। শুধুমাত্র আপনার ভাবনাই বদলে দিতে পারে এই বিশ্বকে।  আর এই জন্য আপনাকে অবশ্যই একজন সাহসী উদ্যোক্তা হতে হবে।

এমন অনেকই আছেন, যাঁরা নিজের কোম্পানি শুরু করার স্বপ্ন দেখেন কিন্তু তারা প্রাথমিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যান। একজন সফল এন্ট্রাপ্রেনার বা উদ্যোক্তা হওয়ার জন্যে সাহস ও দৃঢ় মনোভাব দু’টোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন এন্ট্রাপ্রেনার বা উদ্যোক্তার স্টার্টআপ শুরুর আগের কিছু প্রাথমিক ও মৌলিক বিষয়ে নিচে আলোচনা করা হয়েছে ।

এন্ট্রাপ্রেনারশিপ আপনার জন্যে নয় যদি-

  • আপনি ভালো বেতনের একটি উচ্চপদস্থ চাকরি থাকাকেই উন্নত ক্যারিয়ার মনে করেন।
  • আপনার কাছে লাইফ সেটেলমেন্টের অর্থ – গাড়ী, বাড়ি ও একজন সুন্দরী বউ অথবা একজন ধনী স্বামী।
  • আপনি সপ্তাহ শেষে আপনার স্টার্টআপ নিয়ে শুধু একের পর এক আলোচনাই করেন। কিন্তু আদৌ সেটি বাস্তবায়নের জন্যে কেউ কিছু করে না।
  • আপনার জীবনের একটি মাসের মূল্য আপনার এক মাসের বেতনের থেকে বেশি না হয়।
  • সিধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আপনি সর্বাদাই অন্যের উপর নির্ভরশীল থাকেন এবং ঝুঁকি নিতে ভয় পান।
  • আপনি নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন না। কারণ আপনার অতীত পরিসংখ্যান বলছে, এমনটা করতে গিয়ে আপনি বারবার ব্যার্থ হয়েছেন এবং আপনার ব্যার্থ হওয়ার সম্ভাব্যতা ৯০%।
  • আপনি পরবর্তী স্টিভ জবস, বিল গেটস কিংবা মার্ক জাকারবার্গ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর কিন্তু আপনি আপনার মতাদর্শের সাথে সর্বদাই আপোস করেন।
  • আপনি সবই জানেন এবং জুনিয়র সহকর্মীদের কাছ থেকে কিছু শেখাটা আপনার ইগোতে বাধে। আপনি শুধু প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তাদের (সিইও) কাছ থেকে শিখতেই পছন্দ করেন, কারণ সিইও হওয়াটাই আপনার স্টার্টআপের প্রাথমিক উদ্দেশ্য।

আপনার কি মনে পড়ে, শেষবারের মতো আপনি কবে ঝুঁকি নিয়েছিলেন? কবে আপনি আপনার অফিসের বসের অনুমোদন ছাড়াই দুই সপ্তাহের ছুটি কাটিয়েছিলেন? এন্ট্রাপ্রেনারশিপ অর্থ জীবনের সব নিষ্ঠুর বাস্তবতাগুলোর মুখোমুখি হওয়া, যেখানে আপনাকে প্রতিদিনকার হিসেবে ঝুঁকি নিতে হবে।

এন্ট্রাপ্রেনারশিপ সাহসীদের জন্যে -

  • আপনাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে।
  • রাতারাতিই আপনি বিনিয়োগের টাকা পেয়ে যাবেন না।
  • আপনার সহ-প্রতিষ্ঠাতা আপনাকে মাঝপথে ছেড়ে যেতে পারে।
  • কথা দেয়া সত্ত্বেয় আপনার বিনিয়োগকারী বিনিয়োগে নানা টালবাহানা করবে
  • এমনকি আপনার প্রাথমিক বিনিয়োগের অর্থ তলানিতেও পৌঁছাতে পারে।

আপনি জানেন এই পথ পাড়ি দেয়াটা সহজ নয়। আপনাকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হবে। চাকরীর মতো সোনার হরিণকে ছেড়ে দিয়ে নিজের প্যাশনকে অনুসরণ করার মতো সিধান্তের ফল ভয়ঙ্করও হতে পারে। আমরা বিভিন্ন সফল উদ্যোগের রোমাঞ্চকর সফলতার কথা শুনে থাকি, কিন্তু কেউ আমাদেরকে সেই সফল উদ্যোগের পিছনে হাজারো ব্যার্থতার কথাগুলো বলে না।

এন্ট্রাপ্রেনারশিপ-এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

  • হতাশাঃ হতাশা আপনাকে প্রতি মাসেই গ্রাস করতে পারে। আপনি হয়তো একটি ভালো পরিকল্পনা করবেন, কিন্তু যে কোন কারণেই সেটি ভেঙ্গে যেতে পারে। আমরা সম্ভবত ব্যার্থতার হতাশা এড়িয়ে যেতে পারবো না, কিন্তু আমরা সেখান থেকে শিখতে পারবো- কিভাবে সেটিকে সামলাতে হবে।
  • অনিশ্চয়তাঃ আপনি আপনার সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঝে মাঝেই সন্দিহান হয়ে যান। সাহায্য করার মতো কাউকে খুঁজে পান না। সত্যি বলতে। এটিই ‘নিজেই নিজের বস’ (Becoming your own Boss) হওয়ার অতি সাধারণ একটি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। সব সময় আপনি সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অন্য কারও সাহায্য আশা করতে পারেন না, এমনকি আপনার ঘনিষ্ট পরামর্শদাতা থাকলেও।
  • নিজেই সমস্যাঃ আপনি নিজেকেই সন্দেহ করেন। একের পর এক ব্যার্থতার পর আপনি ভাবতে শুরু করে দেন, আপনি কোন কাজেরই না। এমন পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার মূল পন্থা গভীর অধ্যবসায় ও ঐকান্তিকতা।
  • কাজে আসক্তিঃ এটি মোটামুটি প্রত্যেক উদ্যোক্তার ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। কোন কিছুর প্রতি আসক্তিরই প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এটি ধূমপায়ী থেকে শুরু করে মদ্যপ ব্যাক্তির ক্ষেত্রেও সত্য- যারা কিনা প্রথমদিকে তথাকথিত চাপ কমাতে ধূমপান বা মদ্যপান করা শুরু করে।
  • অনিয়মিত ঘুমঃ অনিয়মিত ঘুমের কারণে আপনি প্রায়শই যে কোন জায়গায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হতে পারেন, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ কোন মিটিং চলাকালীন সময়েও। এ ধরণের খারাপ অভ্যাস আপনার প্ল্যানিং-এ এমনি নতুন পণ্যের উৎপাদনে যথেষ্ট ব্যঘাত সৃষ্টি করতে পারে। সুতরাং একজন ভালো উদ্যোক্তার জন্যে নিয়মিত রুটিন মাফিক ঘুমই কাম্য।
  • পারিবারিক সম্পর্কে অবনতিঃ আপনি কি কখনো এমন অভিজ্ঞতার সম্মুক্ষিন হয়েছেন, যখন আপনি আপনার গার্লফ্রেন্ড, বউ কিংবা বাচ্চাকে সময় দেন নি। অথবা আপনি যখন তাদের সাথে একান্তে বসেন, আপনি শুধু সাম্প্রতিক বিষয়েই কথা বলেন- আপনার অফিস কেমন চলছে, পরের মাসে আপনি নতুন কি করছেন কিংবা আপনার গ্রাহকরা কিভাবে আপনাকে বিরক্ত করছে। এখনই থামুন। আপনার পরিবারের সদস্যদের সাথে কিছু সুন্দর মূহুর্ত উপভোগ করুন, তাদেরকে সময় দিন।
  • খারাপ খাবারের অভ্যাসঃ মোটামুটি সব অবিবাহিত উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেই এটি অতি সাধারণ একটি বিষয়। আপনি যদি অবিবাহিত হয়ে থাকেন তবে নিজের জন্যে স্বাস্থ্য সম্মত খাবার তৈরি করার জন্যে আপনি অযথা সময় ব্যয় করতে চাইবেন না। বদৌলতে আপনি বাজারের সহজলভ্য জাঙ্কফুড খাওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। অবিবাহিত উদ্যোক্তাদের জাঙ্কফুড-এর জায়গায় বাজারে সহজলভ্য ফলমূলই অধিক কাম্য।
  • সামাজিক জীবনে  অনীহাঃ  আপনি সামাজিক জীবনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন না, কারণ আপনি আপনার প্রজেক্ট নিয়েই ব্যস্ত কিংবা নতুন কোন আইডিয়া নিয়ে ভাবছেন। এমতাবস্থায়, শুধুমাত্র আপনার বন্ধুরাই জানবে, আপনি কত মজার সব পার্টি মিস করছেন।

যাইহোক, নিজে কিছু করতে চাইলে আপনাকে অনেক কিছুই ছাড় দিতে হবে, নিত্য নতুন ঝুঁকি নিতে হবে। এটা হতে পারে আপনার শখের চাকরি ছেড়ে দেয়ার মতো ভয়ঙ্কর ঝুঁকিও। কারণ, সাধারণত উদ্যোক্তারা অপরের কোম্পানীর জন্যে কিংবা অপরের হয়ে কাজ করতে পছন্দ করে না।  আপনিও যদি এমন কিছু ভাবছেন, তবে নিচের বিষয়গুলো অন্তত ১ বারের জন্যে হলেও ঝালিয়ে নিন।

চাকরী ছাড়ার আগে লক্ষণীয়-

  • কেন চাকরী ছাড়তে চান? কারণ কি আপনি আপনার বসকে অপছন্দ করেন কিংবা কাজটি আপনার মোটেও মনের মতো নয়? নাকি নিজের প্যাশনকে অনুসরণ করে নিজেই নিজের বস হতে চান?
  • আপনি কি আপনার চাকরীর পাশাপাশি নিজের উদ্যোগটি চালিয়ে যেতে পারবেন না? যদি পারেন, তবে এর পেছনে আপনি কেমন সময় দিতে পারবেন? এতে আপনার চাকরীর কোন ক্ষতি হবে না তো?
  • আপনার প্ল্যান A এবং প্ল্যান B কি? যদি প্ল্যান A এবং প্ল্যান B দু’টোই ব্যার্থ হয় তাহলে কি প্ল্যান C এবং প্ল্যান D আছে?
  • আপনাকে আপনার উদ্যোগের পেছনে কেমন বিনিয়োগ করতে হবে? আপনার বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিনিয়োগ সম্পর্কীত বিষয়গুলো ঠিক করে নিন।
  • আপনাকে আপনার পরিবারকে কেমন সহায়তা প্রদান করতে হবে? এক্ষেত্রে আপনার পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা ও আপনার অবশ্য করনীয় বিষয়গুলো নিয়ে ভাবুন, যেমন- নিজের বিয়ে, বাচ্চাদের শিক্ষা এবং প্রত্যেক মাসে অন্তত একবার হলেও পারিবারিক ভ্রমণ। সময় দিতে পারবেন তো?
  • আপনার বর্তমান চাকরীর বেতন ছাড়া আপনি কতদিন চলতে পারবেন? আপনি যদি মনে করেন, আপনার স্টার্টআপ থেকে আপনি এক বছরের মধ্যেই আয় করতে পারবেন, তবে নিজের জন্যে কমপক্ষে দুই বছরের আর্থিক নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ যে কোন সময় আপনার সুন্দর পরিকল্পনাটি ভেস্তে যেতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমনটি হয়।
  • শেষ প্রশ্ন। চাকরী ছেড়ে দিয়ে নিজের প্যাশন নিয়ে ২-৩ বছর কাজ করার পরও যদি সেটি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ব্যার্থ হয়, তবে পরিস্থিতিটি আপনি কিভাবে মোকাবিলা করবেন? যদি আপনি পরিস্থিতিটি ভেবে এখনই আতঙ্কিত হয়ে গেছেন, তবে আপনি আরও কয়েকবার চাকরী ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে ভাবুন।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে প্রায় প্রতি দশটি উদ্যোগের মধ্যে ৯ টিই ব্যর্থ হয়। কিন্তু দশটার মধ্যে যে উদ্যোক্তার একটা উদ্যোগ সফল হয় সেইটাই বর্তমান বিশ্বকে এগিয়ে নেয় সামনের দিকে। মনে রাখবেন আপনি ব্যর্থ হতে পারেন কিন্তু আপনার জীবন সেখানেই থেমে যাবে না। ১০ জন উদ্যোক্তার মধ্যে যদি ৯ জনই ব্যর্থ হয়, সফলও তো হয় একজন, তাই না? কে জানে সেই একজন আপনিও হতে পারেন। এরপরেও যদি আপনার মনে কিছুটা হলেও সংশয় থেকেই থাকে, আপনি অনুগ্রহপূর্বক এন্ট্রাপ্রেনারশিপ হওয়ার কাঁটাযুক্ত স্বপ্ন পরিত্যাগ করুন।

নিচের বাটনগুলোর সাহায্যে খবরটি শেয়ার করুন