মাইন্ড এন্ড ব্রেইন
Now Reading
অতিমানবীয় মানব মস্তিষ্ক উদ্ভাবনের পথে বিজ্ঞানীরা!

ইতিহাসজুড়ে আমরা এমন কিছু মানুষকে জানি যাদেরকে আমরা মহা-বুদ্ধিমান হিসেবে গণ্য করি। কিন্তু ওই বুদ্ধিমত্তার প্রকৌশল করতে হয় কী করে বা একে ছাপিয়ে যাওয়া সম্ভব কীভাবে তা আমাদের এখনো জানা নেই।

কিন্তু কিছু গবেষকের মতে, জেনোমিক সায়েন্স এবং মেশিন লার্নিং এর অগ্রগতির ফলে এই ক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। এর ফলে হয়তো এমন ব্যক্তি মানুষের আবির্ভাবের সম্ভাবনা তৈরি হবে যাদের বুদ্ধিমত্তা বা বোধশক্তি ইতিহাসের সেরা সেরা বিদ্যানদেরকেও ছাপিয়ে যাবে!

এই অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তা বা বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষদের আবির্ভাব হয়তো আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক আগেই ঘটতে চলেছে! কার্ল ফ্রেডরিখ গস বা জন ভন নেওম্যান অথবা আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই বুদ্ধিমানদের সামষ্টিক বুদ্ধিমত্তাকেও ছাড়িয়ে যাবে নতুন এই অতিমানবীয় বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষেরা!

এমনটাই মনে করেন ‍যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ স্টিফেন সু। তিনি বিজিআই নামের একটি জেনোমিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কগনিটিভ জেনোমিকস ল্যাবের একটি গবেষণা দলের নেতৃত্বে রয়েছেন। ওই গবেষণা দলটি উচ্চতা ও স্থুলতার পাশাপাশি বুদ্ধিমত্তার জেনেটিক রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে।

বেশিরভাগ গবেষকের মতেই, কোনো ব্যক্তি মানুষের বুদ্ধিমত্তা তার জিনগত বৈশিষ্ট এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত ও নির্ণীত হয়। তবে কার্ল ফ্রেডরিখ গস বা জন ভন নেওম্যান অথবা আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো লোকদের বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট জিনগত বৈশিষ্টগুলো হয়তো তাদের বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক বেশি অনুকুলে ছিল; অন্তত গড়পড়তা বুদ্ধিমত্তার অধিকারী সাধারণ মানুষদের তুলনায় তো বটেই।

একবার যদি আমরা জানতে পারি কী করে শতশত ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্টের অধিকারী জিনগত তৎপরতা পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বুদ্ধিমত্তায় রুপান্তরিত হয় তাহলে আমরা হয়তো সেগুলো সনাক্ত করে বাছাই করতে সক্ষম হব। অনেক গবেষকের ধারণা, আমরা এমনকি নতুন নতুন জেনেটিক এডিটিং টুলস ব্যবহার করে ওই সবগুলো জিনগত সুইচ বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের জন্য সহায়ক তৎপরতার দিকে পরিচালিত করতে পারব।

গস, ভন নেওম্যান বা আইনস্টাইনেরও হয়তো এমন কিছু জিনগত বৈশিষ্ট ছিল যেগুলো তাদের বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নে স্বল্প অবদান রাখত। ওই জিনগত বৈশিষ্টগুলোকেও যদি পুরোপুরি বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের অনুকুল তৎপরতার দিকে পরিচালিত করা সম্ভব হতো তাহলে হয়তো এরাও আরো বেশি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে পারতেন। আর এমনটা করতে গিয়ে কোনো জেনেটিক রোগ সৃষ্টির ঝুঁকিও নাকি নেই বলেই বিজ্ঞানীদের মত!

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে যদি এমনটা করা সম্ভব হয় তাহলে আমরা হয়তো এমন কোনো মানুষ তৈরিতে সক্ষম হব যারা পুরো মানবেতিহাসের যে কোনো শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানুষের চেয়েও অনেক বেশি বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হবেন! এমনকি এরা মানুষের চিন্তার সীমাবদ্ধতাগুলো অতিক্রম করে যাওয়ার উপায়গুলোও চিন্তা করে বের করতে সক্ষম হবেন! তবে হতাশার কথা হলো, এই পুরো বিষয়টি এখনো পর্যন্ত শুধু অনুমানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

অন্যদিকে, কিছু গবেষকের মতে, বুদ্ধিমত্তার বিষয়টি এতটাই জটিল যে, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে কখনো এর রুপান্তর সম্ভব হবে না। আর তাছাড়া পারিপার্শ্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতি ও মানুষের জিনগত বৈশিষ্টের মধ্যে প্রতিনিয়ত যে মিথষ্ক্রিয়া হচ্ছে তাও এতোটাই জটিল যে, ‍কৃত্রিমভাবে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে এর মধ্যে কোনো রুপান্তর সম্ভব নয়।

সুতরাং তথাকথিত জেনেটিক এডিটিং টেকনোলজি দিয়ে একজন অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানুষ সৃষ্টি করাও সম্ভভ নয়। কারণ এমনটা করার জন্য কোনো মানুষের জিনগত বৈশিষ্টের যে শতশত রুপান্তর দরকার হবে তা এই প্রযুক্তি দিয়ে করা সম্ভব নয়।
তবে, জেনেটিক গবেষণায় ব্যবহৃত হাতিয়ারগুলোরও উন্নয়ন ঘটে চলেছে দ্রুত। স্টিফেন সু-র মতে, কম্পিউটার এবং এআই টেকনোলজি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের নিজেদের, গড়পড়তা সব মানুষেরই বুদ্ধিমত্তা বেড়ে চলেছে। আর এর মধ্য দিয়েই অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানুষের আবির্ভাব সম্ভব হতে পারেও বলে মনে করেন স্টিফেন সু।

উল্লেখ্য, এই ক্ষেত্রে সবার আগে যা দরকার তা হল বুদ্ধিমত্তার জেনেটিকস সম্পর্কে একটি পরিষ্কার বুঝ। ২০০৩ সালে বিজ্ঞানীরা সর্বপ্রথম মানব জেনোম কোডের একটি চিত্রাঙ্কনে সক্ষম হয়। কিন্তু এ থেকে তেমন বড় কোনো সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়নি। এর মধ্য দিয়ে শুধু বিশেষ কিছু রোগ বা প্রবণতার জন্য দায়ী কয়েকটি জিন সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের মতো জটিল কোনো প্রক্রিয়ার জেনেটিক রহস্য পুরোপুরি উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি।

জেনেটিক এডিটিংয়ের মাধ্যমে কোনো মানুষের আইকিউ লেভেল ১০০০ এর উপরেও ওঠানো সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন স্টিফেন সু! যা সত্যিই অবিশ্বাস্য! বিজিআই এর গবেষণাগারে জেনেটিক এডিটিং টুলসগুলো তেমনভাবেই নাকি উন্নত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। সায়েন্স ম্যাগাজিন নটিলাসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে এমনটাই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্টিফেন সু।

স্টিফেন আরো জানান, বিজিআই ল্যাবে শুধু প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তা বাড়ানোর উপায় আবিষ্কারের জন্যই গবেষণা হচ্ছে না। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং নিয়েও গবেষণা চলছে। অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানুষ এই ধরনের গবেষণার ক্ষেত্রে আরো বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হবেন, যা আমাদেরকে আরো উন্নত মেশিন নির্মাণে সহায়তা করবে। আর কোটি কোটি মানব জেনোম বোঝার জন্য অসংখ্য তথ্য এক সঙ্গে প্রসেস করার মতো উন্নত মেশিন এখনই জরুরি হয়ে পড়েছে। আর একমাত্র অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানুষের পক্ষেই এ ধরনের মেশিন উদ্ভাবন সম্ভব বলে মনে করেন স্টিফেন সু।

এলোন মাস্ক এবং স্টিফেন হকিংয়ের মতো বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, উন্নত মেশিন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকেও পেছনে ফেলে যেতে পারে। তবে মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জুড়ে দিয়ে একটি সুপার কম্পিউটারের ক্ষমতা সম্পন্ন মস্তিষ্কও তৈরি করা সম্ভব।

এছাড়া উন্নত মেশিন আমাদের চিন্তার পদ্ধতিও বদলে দিতে সহায়ক হতে পারে। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোয়ান্টাম ফিজিক্সের ক্ষেত্রেও এমন কোনো যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্ভবপর করে তুলতে পারে, যা আমাদের মানবীয় বুদ্ধিমত্তায় হয়তো কল্পনা করাও সম্ভব নয়। তবে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান লোকটি হয়তো নিজে নিজেই সেই জ্ঞান ব্যবহারে সক্ষম হবেন।

অবশ্য, এও সত্যি যে মানুষের বুদ্ধিমত্তার সীমা-পরিসীমা সম্পর্কে এখনো পরিষ্কার কোনো ধারণা আমরা লাভ করতে পারিনি।
নটিলাসে প্রকাশিত নিবন্ধে স্টিফেন সু বলেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোনো শাখায় মানুষেরা ইতিমধ্যেই তাদের বুদ্ধিমত্তার সর্বোচ্চ সীমা ছুয়েছে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে ১৯৮৩ সালে বিখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কি বলেছিলেন:

কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেছে বলা যায়… আমার মতে, পদার্থ বিজ্ঞান ও গণিতে এমনটা ঘটেছে (অর্থাৎ পদার্থ বিজ্ঞান ও গণিতে মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আর কোনো বড় ধরনের আবিষ্কার বা উদ্ভাবন সম্ভব নয়)… এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে… এমআইটিতে আমি এমন কিছু মেধাবী শিক্ষার্থীকে জীববিজ্ঞান পড়তে দেখেছি ২০ বছর আগে যারা হয়তো পদার্থ বিজ্ঞান পড়তে চাইতো… আমি মনে করি, এর একটা কারণ হয়তো এই যে, জীববিজ্ঞানে এখনো এমন কিছু আবিষ্কার বা উদ্ভাবন সম্ভব যা হয়তো কোনো মেধাবী মানু্ষের সাধারণ বুদ্ধিমত্তার আওতার মধ্যেই রয়েছে… পদার্থ বিজ্ঞান বা গণিতের মতো অন্যান্য ক্ষেত্রে যা আর সম্ভব নয়…

অবশ্য, এর আগেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোনো কোনো শাখায় মানুষেরা তাদের বুদ্ধিমত্তার শেষ সীমা ছুয়ে ফেলেছে বলে ধারণা করা হয়েছিল। অর্থাৎ এর বেশি আর কোনো অসাধারণ মেধাবী মানুষের বুদ্ধির পক্ষেও যাওয়া সম্ভব নয় বলে সিদ্ধান্ত টানা হয়েছিল। কিন্তু পরে ওই সিদ্ধান্ত ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো- জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে রুপান্তর ঘটিয়ে বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করে অতিমানবীয় বোধশক্তি সম্পন্ন মানব মস্তিষ্ক উদ্ভাবনের মধ্য দিয়েও মানুষেরা শিগগিরই জ্ঞান-বিজ্ঞানের আরেকটি শাখায় তাদের স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তার কথিত শেষ সীমাটি ফের অতিক্রম করে যাবে কি?

নিচের বাটনগুলোর সাহায্যে খবরটি শেয়ার করুন